Iran Proxy War: হিজবুল্লাহ ও হামাস কীভাবে ইসরায়েলকে Multi-Front চাপে ফেলছে || অকপট অনুসন্ধান

0

ইরানের Proxy Strategy: হিজবুল্লাহ ও হামাস কীভাবে Middle East সংঘাতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে

সূচিপত্র

ভূমিকা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান, হিজবুল্লাহ এবং হামাস আজ এক গভীরভাবে জড়িত ক্ষমতার ত্রিভুজ। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সীমাবদ্ধতার ভেতর আবদ্ধ থাকলেও, গত দুই দশকে এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তি-লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরান নিজেকে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে “প্রক্সি কৌশল” বা Proxy Warfare-এর মাধ্যমে ইসরায়েল, মার্কিন প্রভাবক্ষেত্র এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন ব্লকের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। এই প্রক্সি যুদ্ধের মূল বাহিনী হলো লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গাজার হামাস—ইরানের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহায়তার প্রধান প্রাপক।

হিজবুল্লাহ: লেবাননে ইরানের দীর্ঘ হাত

হিজবুল্লাহ ১৯৮২ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের মাঝামাঝি গঠিত হয় ইরানের বিপ্লবী গার্ড (IRGC) এবং কুদস ফোর্সের সহায়তায়। ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন দখলের বিরুদ্ধে “সশস্ত্র প্রতিরোধ” আন্দোলন হিসেবে তারা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হিজবুল্লাহ শুধু একটি গেরিলা সংগঠন নয়—লেবাননের একটি রাজনৈতিক শক্তিতেও পরিণত হয়। বর্তমানে তারা লেবানন সংসদে আসন রাখে, মন্ত্রিসভায় প্রভাব বিস্তার করে এবং দক্ষিণ লেবাননে কার্যত একটি “রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র” গড়ে তুলেছে। ইরান হিজবুল্লাহকে বছরে আনুমানিক ৭০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য প্রদান করে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এছাড়া উন্নত রকেট, ড্রোন, রাতের অন্ধকারে কাজ করা ইউনিট, প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইল প্রযুক্তিও পাঠানো হয়। আজ হিজবুল্লাহর হাতে ১,৫০,০০০+ রকেট রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফা, এমনকি পারমাণবিক স্থাপনা পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।

ইসরায়েল যখন গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়, তখন হিজবুল্লাহ উত্তরে সীমান্তে রকেট, মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরায়েলকে একটি “মাল্টি-ফ্রন্ট যুদ্ধে” বাধ্য করে। এই কৌশল ইরানের সামগ্রিক পরিকল্পনার একটি মূল অংশ—ইসরায়েলের সেনা মোতায়েন, সময় এবং মনোযোগকে বিভিন্ন দিকে বিভক্ত করা।

হামাস: গাজা থেকে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ

হামাস ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় জন্ম নিলেও, ২০০০ সালের পর ইরানের সাথে তাদের সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা দ্রুত বাড়তে থাকে। ইরান হামাসকে গ্র্যাড রকেট, ফাজর-৫ মিসাইল, M-৩০২ সিস্টেম, ড্রোন প্রযুক্তি এবং স্থানীয়ভাবে রকেট উৎপাদনের সামর্থ্য প্রদান করে। ২০১৪, ২০২১ এবং ২০২৩ সালের গাজা সংঘাতে দেখা গেছে—হামাসের রকেট ক্ষমতা প্রতিবারই আগের তুলনায় আরও উন্নত, আরও দীর্ঘ-পাল্লার, এবং আরও স্বয়ংক্রিয়।

ইরানের কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, হামাস এমন একটি ফ্রন্ট যা ইসরায়েলকে দক্ষিণে জড়িয়ে রাখতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের “ইসরায়েল-বিরোধী প্রতিরোধ অক্ষ”কে শক্তিশালী করে। হামাস যত বড় আক্রমণ চালায়, ইসরায়েলকে তত বেশি সৈন্য, অর্থ, অস্ত্র এবং রাজনৈতিক চাপ গাজায় কেন্দ্রীভূত করতে হয়—এ সময়ে ইরান অন্য ফ্রন্টগুলোকে সক্রিয় রাখে যেমন লেবানন, সিরিয়া অথবা ইয়েমেন।

ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তার

ইরান শুধুমাত্র হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যেই থেমে নেই। “Axis of Resistance” নামে পরিচিত জোটে রয়েছে—

  • ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া (PMF)
  • ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী
  • সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী
  • আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ফাতেমিওয়ুন-জয়নাবিওন ব্রিগেড
এই নেটওয়ার্ক ইসরায়েলকে চারদিক থেকে চাপ দেওয়ার একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা-বলয় তৈরি করেছে। ইরাক থেকে ড্রোন, সিরিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, লেবানন থেকে রকেট এবং ইয়েমেন থেকে লং-রেঞ্জ মিসাইল—এই সব একসাথে যুক্ত হলে ইসরায়েলের জন্য এটি একটি সত্যিকারের বহুমুখী যুদ্ধ।

ইরানের মূল ভূ-রাজনৈতিক কৌশল

ইরানের প্রক্সি কৌশল তিনটি মূল উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে— ১. সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো
ইরান জানে যে সরাসরি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করলে তাদের অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভেঙে পড়তে পারে। তাই তারা প্রক্সি ব্যবহার করে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করে। ২. ইসরায়েলের সামরিক বাজেট ও সেনা মোতায়েন ছড়িয়ে দেওয়া
বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ মানে ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজন। ৩. পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প এগিয়ে নেয়া
যুদ্ধের চাপ অন্যদিকে বিভক্ত থাকায় ইরান তার অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রকল্প আরও সহজে চালিয়ে যেতে পারে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েল গত ১৫ বছর ধরে লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস, সিরিয়ায় ইরানের অস্ত্র কনভয় লক্ষ্য করে এয়ারস্ট্রাইক এবং গাজায় বারবার সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে ইরানের এই প্রক্সি জোটের বিস্তৃত প্রভাবের কারণে ইসরায়েল কখনোই সম্পূর্ণভাবে হিজবুল্লাহ বা হামাসকে দমন করতে সক্ষম হয়নি। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘর্ষ দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জন্য “অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ” হয়ে উঠছে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

ইরানের প্রক্সি কৌশল শুধু ইসরায়েল নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিস্ফোরণ-প্রবণ ভূ-রাজনৈতিক জোনে পরিণত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে নৌবাহিনী ও বিমানঘাঁটি তীব্র সতর্কতায় রাখতে। সৌদি আরব, ইউএই এবং ইসরায়েল পারস্পরিক নিরাপত্তা জোটের দিকে ঝুঁকছে। এইভাবে মধ্যপ্রাচ্য আরও মেরুকৃত হয়ে উঠছে এবং ইরানের প্রক্সিগুলি ভবিষ্যতে বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।

FAQ

হিজবুল্লাহ কি ইরানের নিয়ন্ত্রণে?
ইরানের সামরিক, আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও তারা লেবাননের রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থান রক্ষা করে।

হামাস কি পুরোপুরি ইরানের প্রক্সি?
পুরোপুরি নয়, তবে সামরিকভাবে ইরানের সহায়তা তাদের সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।

ইরান কেন প্রক্সি যুদ্ধ চালায়?
সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, ইসরায়েলকে বহু ফ্রন্টে চাপে রাখা এবং নিজের সামরিক প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

রেফারেন্স- 

  1. Byman, D. (2020). Road Warriors: Foreign Fighters in the Armies of Jihad. Oxford University Press.
  2. Norton, A. R. (2014). Hezbollah: A Short History. Princeton University Press.
  3. U.S. Congressional Research Service (2023). Middle East Proxy Conflicts.
  4. UN Security Council Reports (2021–2024).
  5. Al Jazeera Middle East Archives.
  6. CSIS (Center for Strategic & International Studies) Reports on Iran Proxy Network.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
To Top