আধুনিকতার ছোঁয়া, শহুরে ব্যস্ততা এবং সময়ের বিবর্তনে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী খেলা। যেসব খেলায় একসময় গ্রামের উঠোন, পাড়ার পথ, মাঠ ভরে যেত প্রাণচাঞ্চল্যে—সেগুলো আজ স্মৃতি হয়ে আছে কেবল বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের হৃদয়ে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এসব খেলার নামই শোনেনি। এমনই এক মনোরম অথচ এখন প্রায় লুপ্ত খেলা হলো ফুলটোকা বা টুকাটুকি খেলা। কোথাও কোথাও এই খেলা আবার ‘বউরানী’ খেলা নামেও পরিচিত।
এই খেলাটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং শিশু-কিশোরদের বুদ্ধি, মনোযোগ, স্মরণশক্তি ও দলগত সমন্বয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই খেলার নিয়ম, খেলার ধরণ এবং তার পেছনের আনন্দঘন স্মৃতিগুলো।
ফুলটোকা বা টুকাটুকি খেলার নিয়ম ও পরিবেশ
ফুলটোকা খেলতে বেশি কিছু লাগে না—শুধু একটি খোলা জায়গা এবং একটি উৎসাহী দল। সাধারণত ১৪ জন খেলোয়াড় হলে খেলা বেশ জমে ওঠে। ছেলে-মেয়ে সবাই মিলেই খেলায় অংশ নিতে পারে, যা খেলাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দলবিভাগ ও প্রস্তুতি
-
১৪ জন খেলোয়াড়কে দুই দলে ভাগ করা হয়।
-
প্রত্যেক দলের একজন করে দলপতি বা রাজা থাকে।
-
রাজাকে কেন্দ্র করে ৭ জন করে খেলোয়াড় থাকে, যারা এক সারিতে বসে খেলা শুরু করে।
-
খেলার স্থান দুই ভাগে বিভক্ত থাকে—মাঝে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রেখে দুই পাশে দুটি রেখা টানা হয়।
-
দুই দল এই রেখা বরাবর মুখোমুখি বসে পড়ে।
গোপন নামকরণ
খেলার ধরণ: বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হও
প্রথমে টসে জেতা দলের রাজা চুপচাপ হাত দিয়ে বিপক্ষ দলের একজন খেলোয়াড়ের চোখ বন্ধ করে ডাক দেন—
“আয়রে আমার গোলাপ!”“আয়রে আমার লিচু!”“আয়রে আমার জুঁই!”
ডাকা নামটি যেই খেলোয়াড়ের, সে নিঃশব্দে উঠে এসে চোখ-বন্ধ খেলোয়াড়ের কপালে মৃদু টোকা দিয়ে তার জায়গায় ফিরে যায়।
এরপর সবাই একসঙ্গে স্লোগান দেয়—
“ক খ গ — মাথায় হেড!”
এভাবে যে দল প্রথমে মাঝের সীমা অতিক্রম করে, তারা জয়ী হয়।
ফুলটোকা: শুধু খেলা নয়, এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যায়াম
-
স্মরণশক্তি
-
মনোযোগ
-
দ্রুত অনুমান
-
দলগত সমন্বয়
-
প্রতিপক্ষকে ছলনা করার দক্ষতা
খেলার সময় বিভিন্ন ইশারা, হাসির আড়ালে কৌশল, চুপিসারে চলাফেরা—সব মিলিয়ে খেলাটি হয়ে উঠত অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং আনন্দময়।
শৈশবের স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
ফুলটোকা বা টুকাটুকি খেলা শুধু স্মৃতির পাতায় নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গর্ব। এই খেলাগুলোকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রয়োজন পরিবার, স্কুল, সমাজ এবং শিশুদের প্রতি সচেতন উদ্যোগ।
উপসংহার
গ্রামের হারিয়ে যাওয়া এসব খেলায় লুকিয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি, বন্ধুত্ব, সমন্বয় এবং সৃজনশীলতার বীজ। ফুলটোকা খেলা শুধু শিশুদের আনন্দই দিত না, বরং মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সহায়ক ছিল। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যবাহী খেলা শেখানো গেলে, তারা শুধু এক মনোরম খেলার অভিজ্ঞতাই পাবে না, বরং নিজেদের শৈশবকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবে।
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
ইমেল আইডি: contact.okopotanusandhan@gmail.com
লেখার ফরম্যাট: অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিপ্যাডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন: আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা উল্লেখ করতে ভুলবেন না।


