সঞ্চিতা ঘোষের ৩টি হৃদয়স্পর্শী অণুগল্প
লেখিকা: সঞ্চিতা ঘোষ
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য গল্প। কোথাও মায়ের অসীম ভালোবাসা, কোথাও নিঃস্বার্থ সমাজসেবা, আবার কোথাও দৈনন্দিন জীবনের এক চিলতে হাসি। লেখিকা সঞ্চিতা ঘোষ তাঁর সহজ-সরল অথচ আবেগঘন লেখনীর মাধ্যমে সেই গল্পগুলোকেই তুলে ধরেছেন তিনটি ভিন্ন স্বাদের অণুগল্পে।
১. কুমারী মা
নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে অঝোরে কাঁদছিল মেয়েটি।
হঠাৎই সে ডাক্তারবাবুর হাত জড়িয়ে ধরে বলল—
"আপনার দুটি পায়ে পড়ি, আমার গর্ভপাত করাবেন না।"
ডাক্তার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
— "আপনার পরিবারের লোকজন কি জোর করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?"
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
ডাক্তার বললেন,
— "আমি ওদের সঙ্গে কথা বলছি। নিশ্চয়ই বোঝানো যাবে।"
মেয়েটি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— "কেউ বুঝবে না। কারণ আমি একজন কুমারী মা।"
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে আবার বলল,
— "যে মানুষটি ভালোবাসার অভিনয় করে আমার সবকিছু নিয়ে চলে গেছে, সে তো আর ফিরবে না। কিন্তু আমার গর্ভের এই শিশুর কী দোষ? সে কেন পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শাস্তি পাবে?"
শেষবারের মতো অনুরোধ করল সে—
— "আপনি শুধু বাইরে গিয়ে বলবেন, অপারেশন সফল হয়েছে।"
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর নীরবে সম্মতি জানালেন।
সেদিন একজন চিকিৎসক শুধু একটি প্রাণই বাঁচাননি, বাঁচিয়েছিলেন এক মায়ের মাতৃত্বও।
২. সমাজসেবী
মাত্র আট বছর বয়স থেকেই মিহির অন্যসব শিশুদের মতো ছিল না।
যেখানে তার সমবয়সীরা খেলাধুলায় ব্যস্ত, সেখানে মিহিরের মন জুড়ে ছিল বাবার শেষ ইচ্ছা।
মৃত্যুশয্যায় বাবা বলেছিলেন—
"আমার স্বপ্ন তুই পূরণ করবি বাবা।"
মিহিরের বাবা নিজেও একজন সমাজসেবী ছিলেন।
অসমাপ্ত স্বপ্নটি তিনি ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
মিহির পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করল।
রাস্তার কোনো অসহায় মানুষকে দেখলেই সাহায্যের জন্য ছুটে যেত।
ধীরে ধীরে বড় হয়ে সে সত্যিই একজন পরিচিত সমাজসেবীতে পরিণত হলো।
মানুষ তাকে ভালোবাসতে শুরু করল।
জনপ্রিয়তা বাড়তেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাকে দলে টানার চেষ্টা করল।
প্রলোভনেরও অভাব ছিল না।
কিন্তু মিহির নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল।
সবাইকে একটাই উত্তর দিল—
"আমি রাজনীতিতে জড়াতে চাই না। মানুষ আমাকে সমাজসেবী হিসেবে ভালোবাসে। সেই পরিচয়ই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এর বেশি আর কিছু চাই না।"
৩. অদ্ভুতুড়ে
মিঠু কাকুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।
নতুন বাড়ি।
এখনও বিদ্যুতের সংযোগ হয়নি।
অগত্যা অন্ধকার ঘরেই রাত কাটাতে হলো।
অন্ধকারে আমার এমনিতেই ভীষণ ভয়।
রাত গভীর হতেই হঠাৎ মনে হলো—
আমার খাটটা যেন নড়ছে!
ভয়ে বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে খাটের নিচে তাকালাম।
কেউ নেই।
ঘরের চারপাশেও কিছুই চোখে পড়ল না।
সারা রাত ভয়ে একফোঁটা ঘুম এল না।
ভোর হতেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আমাকে দেখে কাকু হেসে বললেন—
— "কী রে, কাল রাতের ভূমিকম্পটা টের পেয়েছিলি তো?"
আমি তখন নিজের কাণ্ড ভেবে শুধু মাথা চুলকাতে লাগলাম।
ভূত নয়,
ওটা ছিল ভূমিকম্প!
উপসংহার
সঞ্চিতা ঘোষের এই তিনটি অণুগল্প আকারে ছোট হলেও ভাবনায় গভীর। 'কুমারী মা' মাতৃত্বের মানবিক আবেদন তুলে ধরে, 'সমাজসেবী' নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শকে সম্মান জানায় এবং 'অদ্ভুতুড়ে' পাঠকের মুখে হাসি ফোটায় এক সহজ-সরল পরিণতির মাধ্যমে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে জীবনের নানা অনুভূতি তুলে ধরার দক্ষতাই এই গল্পগুলোর প্রধান শক্তি।
লেখিকা পরিচিতি
সঞ্চিতা ঘোষ শিলিগুড়ির বাসিন্দা। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি অকপট অনুসন্ধান-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর লেখা অণুগল্প, ছোটগল্প ও কবিতা নিয়মিত বিভিন্ন সাহিত্য সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সহজ ভাষা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে গভীর অনুভূতিতে রূপ দেওয়ার ক্ষমতাই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
ইমেল আইডি:
contact.okopotanusandhan@gmail.com
লেখার ফরম্যাট:
অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিবোর্ডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন
- আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
- কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

