শেখর দেবনাথের ৪টি সেরা অণুগল্প
ভূমিকা:
অণুগল্পের
সার্থকতা তার সংক্ষিপ্ত পরিসরে জীবনের গভীর সত্যকে ফুটিয়ে তোলায়। আজ আমাদের
প্ল্যাটফর্মে আমরা নিয়ে এসেছি লেখক শেখর দেবনাথের লেখা চারটি ভিন্ন স্বাদের
অণুগল্প—'যাচক', 'স্বপ্নভঙ্গ', 'চেয়েছিলো' এবং 'পরিণতি'। প্রতিটি
গল্পই যেন জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তের আয়না।
১. যাচক
শ্রীচরণেষু, আমি একজন যাচক, এই হোক আমার পরিচয়—নাম নাইবা বললাম। হয়তো আপনি আমাকে চেনেন না, তবে এটা বলতে পারি আপনার কাছে যা যাচ্ঞা করছি তা আপনার
অত্যন্ত আদরের, আর সেটি আমার ভালোবাসার ধন; তাই চাওয়ার সাহস পেয়েছি। আমি যতদূর জানি, কারো আদরের বস্তুটি কারো ভালোবাসার ধন হলে অনায়াসেই সে
বস্তুটিকে তার হাতে সমর্পণ করে। আর আমি আশা রাখছি আপনিও তাই করবেন।
আমি
আপনার কোন জিনিসটি চাইছি সেটা এতক্ষণে বুঝে গেছেন নিশ্চয়। এবার প্রশ্ন হলো, ধারক হিসাবে আমি কতটা সার্থক তা আপনার বিবেচনার বিষয়। এ
বিষয়ে আমি কোনো সার্টিফিকেট দেব না, এ ভার আপনার উপরেই ছেড়ে দিলাম, কারণ পরীক্ষক হিসাবে আপনার খ্যাতি প্রশংসার্হ। তবে এটুকু বলে রাখি, জিনিসটি না পেলে আমার জীবন অর্থহীন হবে।
আপনি
আমার সাথে দেখা করতে চাইলে যে কোনো রবিবার চায়ের নিমন্ত্রণ করতে পারেন, আমার আপত্তি নেই—কেননা অন্যদিন স্কুল থাকায় সুবিধা হবে না
তেমন। তাছাড়াও আপনি আমাদের বাড়ি আসতে পারেন এভাবে, এসপ্ল্যানেডে মেট্রোতে চড়ে রবীন্দ্রসদন নেমে হাতের বাম পাশের গলিতে শ্যামাপদ
গোস্বামীর বাড়ি; উনি আমার বাবা। সামনে গিয়ে
চাওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই, তাই পত্রের
সাহায্য নিলাম। পারলে ত্রুটি মার্জনা করবেন।
আপনার
পরবর্তী পদক্ষেপের আশায় রইলাম, আশা রাখি নিরাশ
হব না।
ইতি, স্নেহধন্য যাচক।
২. স্বপ্নভঙ্গ
শৈল ও
নীরদের অভাবের সংসার । নীরদ মজুরি করে যা উপার্জন করে তাতে দিন চলাই ভার,তবুও দুই ছেলেকে পড়াশুনা করাতে ছাড়ে না সে । সে শৈলকে
বলে-'
তুমি কেন চিন্তা করছো,ছেলেরা বড়ো মানুষ হবে সেদিন আমাদের সমস্ত কষ্ট ঘুঁচে যাবে '।
নীরদের
দুই ছেলে আজ মস্ত মানুষ হয়েছে,মোটা বেতনের
সরকারি চাকুরে।শৈল একদিন কাঁদো কাঁদো গলায় নীরদকে বলছে-'ওগো সংসারে আজ কী পরিবর্তন হলো'?নীরদ হাসতে হাসতে উত্তর দেয়-'কী বলছো তুমি,সংসারে পরিবর্তন হয়নি ? আগে বাড়িতে
থাকতাম আমরা চারজন,আজ শুধু তুমি
আর আমি । আবার চালা ঘরটিতেও তো তিনটে নতুন বাঁশের ঠেকনা দেওয়া হয়েছে'।
৩. চেয়েছিলো
নেহার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করছে,দেখলে বেশ বোঝা যায় বয়সকালে বেশ সুশ্রী ছিলো। গড়নটাও বেশ ছিপছিপে এখনও রূপের
লাবণ্যটা আন্দাজ করা কঠিন নয়।তবে তার বিয়ে হয়নি,কেননা বিয়ে দেবার মতো তার কেউ ছিলো না,নিজেও মুখ ফুটে বলতে পারেনি কাউকে।চালচুলোহীন তার দিন একভাবে বয়ে চলেছে।
সেদিন
পাশের বাড়ির সীমার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে বেশ একটা আলোচনা সভা বসেছিলো।নেহাও ছিলো সেই
আসরের একজন সদস্যা। চলছিলো পাত্রপক্ষের ধনসম্পত্তির বিচার-বিশ্লেষণ ,আশীর্বাদে সীমাকে কী দিয়েছে,পাত্রের সাথে সীমার কথোপকথনের আলোচনা ইত্যাদি ইত্যাদি । ঠিক এমনি সময় নেহার
চোখ ছলছল করে ওঠে এবং সবার অলক্ষ্যে শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখদুটো মুছেও ফেলে সে-- এর
কারণ আমার জানা নেই।
৪. পরিণতি
বারটা ছিলো শনিবার,বিকেলে টোটোতে হঠাৎ তোমার সাথে দেখা,সেটাই ছিলো আমাদের প্রথম দেখা তাই না মিঠি ? সত্যি বলছি তোমাকে দেখার পর বুকের ভিতরটা কেমন ঢিপ ঢিপ করছিলো।সেকথা ভাবলে
এখনও আমার মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।তুমি তো সেদিন ভালো করে দেখোই নি আমাকে কী লজ্জাটাই
না পেয়েছিলে।তারপর সরস্বতী পূজার দিন পার্কে যখন তুমি আমার পাশে বসেছিলে,তোমাকে প্রথম পাশে পেয়ে কী আনন্দই না হয়েছিল,বলে বোঝাতে পারব না।আর সেদিন তোমার চোখে যখন কী একটা
পড়েছিলো তুলে দিতে গিয়ে আমি তো হা করে ছিলাম,দেখলাম বিয়ের কুড়িবছর পরেও আজ আমি সেই চোখের দৃষ্টির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি।
কী গো
আটটা যে বেজে গেল,ঘুমের ঘোরে কার
সাথে কথা কথা বলছো বলো তো ? নাও নাও উঠে
পড়ো স্কুলে দেরি হয়ে যাবে কিন্তু ।
উপসংহার:
শেখর
দেবনাথের এই অণুগল্পগুলো আমাদের জীবনের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে। আপনাদের কাছে কোন
গল্পটি সবচেয়ে বেশি ভালো লাগলো, তা আমাদের
কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন।
✍️ লেখক পরিচিতি
শেখর দেবনাথ একজন নবীন
অথচ সংবেদনশীল সাহিত্যস্রষ্টা। তিনি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ
থানার অন্তর্গত গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা। সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছোটবেলা
থেকেই। বিশেষ করে অনুগল্প ও কবিতা লিখতে ও পড়তে তিনি ভালোবাসেন।
সাধারণ
মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য,
পারিবারিক টানাপোড়েন, স্বপ্নভঙ্গ ও নীরব কষ্ট
তাঁর লেখার প্রধান বিষয়। অল্প কথায় গভীর অর্থ প্রকাশ করাই তাঁর লেখনীর বিশেষত্ব।
সমাজের প্রান্তিক মানুষের অনুভূতি ও বাস্তব জীবনচিত্রকে তিনি সহজ ভাষায়
হৃদয়স্পর্শী করে তুলে ধরেন।
বর্তমানে
তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত এবং অনুগল্প ও কবিতার মাধ্যমে পাঠকমহলে
নিজের ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
📧 যোগাযোগ: shekhar1995debnath@gmail.com
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা
আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের
অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
ইমেল আইডি: contact.okopotanusandhan@gmail.com
লেখার ফরম্যাট: অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিপ্যাডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন: আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা
উল্লেখ করতে ভুলবেন না।

