তরুর দুঃখ -গাজী জুনায়েদ রাসেল
বিকেলে গিয়েছিলাম জাতীয় উদ্যান ‘বলদা গার্ডেন’-এ, খুব বেড়াবার দিন ছিলো। এই যান্ত্রিক কংক্রিটের শহরে কতদিন মন ভরে গাছ দেখি না; গাছের সুশীতল ছায়া ও সান্নিধ্যের লোভে তাই অঝোর বৃষ্টির দিনেও বাইরে বেরিয়ে পড়া। একটু আগে বৃষ্টি থেমেছে, আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা এখনো রয়ে গেছে। সেই মেঘ ভেদ করে আসা বিকেলের দুর্বল সূর্যকিরণ চারদিকে এক অনন্য উজ্জ্বল রূপ ধারণ করেছে; মেঘের ওপাশে যেন লুকিয়ে ছিল এক মায়াবী গোধূলি।
চারপাশ সবুজ গাছপালায় আচ্ছাদিত—মুহূর্তেই মন ভালো করে দেওয়ার মতো এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। কিছু চেনা, কিছু অচেনা কত রকমের গাছের সমাহার! রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকছি, এমন সময় গেটের ওপরে কনক্রিটের কাঠামোর সাথে আকড়ে ঝুলতে থাকা নীলমণিলতা অভিমানের সুরে ডুকরে উঠলো, “এতদিনে তোমার আসার সময় হলো?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন, কী হয়েছে?” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল, “ একটু আগে বৃষ্টিতে ভিজেছি, এখন হালকা রোদেও আমার গামছা পোড়ার মতো গা জ্বালা করছে। সামনে যাও, আমি আর কথা বলতে পারব না।”
কথাটি শুনে আমার মন হু হু করে উঠল। প্রিয়জনদের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি, আর গাছেরা তো আমার একান্তই আপন।
সামনে এগোতেই এক বৃদ্ধ বটের কাছে গিয়ে মন আরও উদগ্রীব হয়ে উঠল। তার চেহারায় স্পষ্ট মলিনতার ছাপ; একটি বড় ডাল নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই প্রশ্ন করলাম—
“তোমাকে কি এভাবে কেটে ফেলা হবে?”
বটের নিস্তরঙ্গ উত্তর, “না।”
“শহরের গাড়ির অতিরিক্ত হর্ণে কি তোমাদের খুব সমস্যা হয়?”
“না, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।”
“তোমাদের সবাইকে কি নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় তো?”
“হ্যাঁ, হয়।”
“তাহলে তোমরা সবাই এত গম্ভীর হয়ে আছো কেন? আসল সমস্যাটা কোথায়?”
এবার বুঝি আমার প্রশ্নের পালা শেষ হলো। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে বৃদ্ধ বটগাছটি কথা বলতে শুরু করল।
“আচ্ছা, তুমি তো নিজেকে বৃক্ষপ্রেমী মানুষ বলে দাবি করো, বলতো—প্রেম আসলে কী?”
আমি খুব ভেবেচিন্তে একটা দার্শনিক উত্তর দিতে যাব, এমন সময় সে আমাকে থামিয়ে দিল। চারপাশ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “চারপাশে তাকিয়ে দেখো, গাছপালা বাদ দিলে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কাদের দেখছ?”
তাকালাম, দেখলাম অসংখ্য প্রেমিক-যুগল গাছের ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে আছে। তাদের অধিকাংশেরই বয়স অনূর্ধ্ব বিশ; কেউ পরস্পরকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে বসে আছে, কেউ আবার তার সঙ্গীকে চুম্বনে ব্যস্ত।
অগণিত বসন্ত পার করে দেওয়া মর্মাহত বটবৃক্ষটি একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বলল, “এরা তো প্রেম আর শারীরিক কামনার পার্থক্যই বোঝে না। কেবল শারীরিক সংস্পর্শই যদি প্রেমের প্রধান উপজীব্য হয়, তবে প্রেম কীভাবে মহান হবে? তাতেও হয়তো আমাদের এত ক্ষোভ থাকত না; কিন্তু যখন দেখি একটি ছেলে ভিন্ন ভিন্ন দিনে আলাদা আলাদা রমণীর সাথে এখানে আসে এবং এসেই শরীরসর্বস্বতায় লিপ্ত হয়, তখন কি তাকে প্রেমিক বলা যায়? পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহৎকর্ম ‘প্রেম’ যখন এই কনক্রিটের শহরের তথাকথিত বৃক্ষউদ্যানে এসে কলঙ্কিত হয়, তখন আমরা গাছেরা কীভাবে ভালো থাকব বলো?”
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। নিজে মানুষ ও প্রেমিক হয়েও এই তথাকথিত আধুনিক প্রেমিক-প্রেমিকাদের অন্ধপনার পক্ষে আমার আর কোনো যুক্তি বা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চলে আসব, এমন সময় একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেদি গাছটি ফিসফিস করে বলে উঠল—
“আমার ভেতরটা প্রাকৃতিকভাবেই লাল, কিন্তু মানুষের এই হীন মানসিকতা ও প্রেমহীনতার কারণে আমাদের চারপাশের ওপরের সবুজ রূপটাও ক্ষতবিক্ষত হতে বেশি দেরি নেই বোধহয়।
লেখকঃ গাজী জুনায়েদ রাসেল (বাংলাদেশ,ফরিদপুর)
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
ইমেল আইডি: contact.okopotanusandhan@gmail.com
লেখার ফরম্যাট: অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিপ্যাডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন: আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা উল্লেখ করতে ভুলবেন না।

