মানসিক অত্যাচার
✍️ লেখিকা: সঞ্চিতা ঘোষ
শান্তিপুরের এক বিশাল বাড়ি— 'আনন্দ নীড়'।
সেই বাড়িতেই বাস করতেন রামবাবু ও তাঁর স্ত্রী মাধবী। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এই বড় বাড়িটাই ছিল তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।
বিয়ের দু'বছর পর তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান।
নাম রাখা হয় মিষ্টি।
নামের মতোই ছিল তার মিষ্টি হাসি, সরল মন আর নিষ্পাপ শৈশব।
সময়ের সঙ্গে মিষ্টি বড় হতে থাকে। দশ বছর বয়সে পৌঁছে সে মায়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে।
মাধবী প্রতিদিন গল্পের ছলে মেয়েকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতেন—
"কেউ যদি তোমার শরীরে এমনভাবে হাত দেয়, যা তোমার ভালো না লাগে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করবে। আমাকে, বাবাকে কিংবা আশেপাশের বড়দের সব কথা খুলে বলবে।"
এভাবেই ছোটবেলা থেকেই তিনি মেয়েকে 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ'-এর পার্থক্য বোঝাতে চেষ্টা করতেন।
প্রতিদিন রামবাবুই মিষ্টিকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন এবং নিয়ে আসতেন।
কিন্তু একদিন হঠাৎ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
মিষ্টির স্কুলে যাতায়াতের জন্য তখন ড্রাইভার হিসেবে রাখা হয় পাশের এলাকার যুবক বিদ্যুৎকে।
বিদ্যুৎ প্রতিদিন মিষ্টিকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত।
মাঝেমধ্যে চকলেটও কিনে দিত।
সরল মনের মিষ্টি খুশি হয়ে মাকে বলত—
"মা, বিদ্যুৎ আঙ্কেল খুব ভালো। আমাকে চকলেট দেয়।"
মাধবীও ভেবেছিলেন, ছেলেটি নিশ্চয়ই ভালো মানুষ।
কিন্তু মানুষের মুখ আর মনের মধ্যে যে কত বড় পার্থক্য থাকতে পারে, তা তিনি তখনও বুঝতে পারেননি।
একদিন রামবাবুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়।
সেদিন সকালে মাধবী নার্সিংহোমে যাওয়ার আগে মিষ্টির ব্যাগে বাড়ির একটি চাবি দিয়ে যান।
স্কুল ছুটির পর বিদ্যুৎ মিষ্টিকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
বাড়িতে তখন আর কেউ নেই।
মিষ্টি নিজের মতো খাওয়া-দাওয়া করে টিভি দেখছিল।
বিদ্যুৎ বাইরে অপেক্ষা করছিল।
মাধবীর ফোন এলে তিনি জানান, আরও দুই ঘণ্টা পরে আসতে।
এই সুযোগেই বিদ্যুতের নোংরা মানসিকতা প্রকাশ পায়।
চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে সে মিষ্টির ঘরে ঢোকে।
তারপর ধীরে ধীরে শিশুটির ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘনের চেষ্টা করে।
মিষ্টি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শেখানো কথা মনে করে প্রতিবাদ জানায়।
সে চিৎকার করে ওঠে—
"বাঁচাও... বাঁচাও..."
কিন্তু বিদ্যুৎ থামেনি।
ভয়ে মিষ্টি খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে।
তখন বিদ্যুৎ মিথ্যা অভিনয় করে বলে—
"ও কাকিমা, আপনি চলে এসেছেন!"
মায়ের কথা ভেবে মিষ্টি বেরিয়ে আসতেই সে আবার শিশুটিকে ধরার চেষ্টা করে।
নিজেকে বাঁচাতে দৌড়াতে গিয়ে মিষ্টি সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়।
তবুও সে হার মানেনি।
শেষ শক্তি দিয়ে বিদ্যুতের হাতে কামড় বসিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়ির রীতা পিসির কাছে ছুটে যায়।
সেখানে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সব ঘটনা খুলে বলে।
রীতা সঙ্গে সঙ্গে মাধবীকে খবর দেন।
ঘটনা জানার পর মাধবী কোনো আপস না করে সরাসরি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন।
আইনের বিচারে বিদ্যুতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
কিন্তু বিচার পেলেও ক্ষত কি এত সহজে মুছে যায়?
ঘটনার পর মিষ্টি এক বছরেরও বেশি সময় প্রায় কথা বলা বন্ধ করে দেয়।
সে চুপচাপ ঘরের এক কোণে বসে থাকত।
এদিকে রামবাবুও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পরিবারটি শান্তিপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে।
পরিবেশ বদলানোর পর ধীরে ধীরে মিষ্টি আবার কথা বলতে শুরু করে।
সময় গড়িয়ে তার বয়স আঠারো বছর হয়।
তবুও আজও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে—
"বাঁচাও... বাঁচাও..."
শরীরের ক্ষত একদিন সেরে যায়।
কিন্তু মানসিক ক্ষত অনেক সময় সারাজীবন রয়ে যায়।
গল্পের বার্তা
'মানসিক অত্যাচার' শুধুমাত্র একটি গল্প নয়, বরং প্রতিটি অভিভাবকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক বার্তা।
- শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
- শিশু যদি কোনো অভিযোগ করে, তাকে অবহেলা না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
- অপরাধী পরিচিত হলেও তাকে আড়াল করা নয়, আইনের হাতে তুলে দেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত।
- মানসিক আঘাতও শারীরিক আঘাতের মতোই গভীর হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখিকা পরিচিতি
সঞ্চিতা ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাসিন্দা। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর। গত এক বছর ধরে তিনি অকপট অনুসন্ধান অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাঁর অণুগল্প, ছোটোগল্প ও কবিতা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সহজ ভাষায় সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক অনুভূতি এবং সচেতনতামূলক বিষয়কে সাহিত্যরূপ দেওয়াই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
লেখার ফরম্যাট
অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিবোর্ডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন
- আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
- কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

