রিংকি পালের ৪টি হৃদয়স্পর্শী অণুগল্প | সৈনিক, জীবন সংগ্রাম, ভালোবাসার টান ও মাতৃ হৃদয় | অকপট অনুসন্ধান

0

রিংকি পালের ৪টি হৃদয়স্পর্শী অণুগল্প

বিষয়সূচি (Click to Toggle)

    রিংকি পালের চারটি হৃদয়স্পর্শী বাংলা অণুগল্পের প্রতীকী ফিচার ইমেজ

    লেখিকা: রিংকি পাল

    মানুষের জীবনের প্রতিটি অনুভূতি কখনো দেশপ্রেমে, কখনো সংগ্রামে, কখনো ভালোবাসায় আবার কখনো মাতৃত্বের মমতায় ধরা দেয়। লেখিকা রিংকি পালের এই চারটি অণুগল্প সেইসব জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে রয়েছে ত্যাগ, সাহস, মানবিকতা এবং ভালোবাসার গভীর উপলব্ধি।


    ১. সৈনিক

    বৌভাতের পরের দিনই পবনকে কর্মস্থলে ফিরে যেতে হয়। হাতে মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি ছিল। নতুন বধূ সোমা শ্বশুরবাড়িতেই থেকে যায়।

    বিয়ের তিন মাসও পূর্ণ হয়নি, এমন সময় পবন ফোন করে জানায় যে তার পোস্টিং হয়েছে কাশ্মীরে। সেখানে নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকায় নিয়মিত যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না।

    কয়েকদিন পর হঠাৎ বাড়িতে ফোন আসে।

    পবন আর নেই।

    দেশের জন্য সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে সে শহীদ হয়েছে। এমনকি তার মরদেহও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

    খবরটি শুনে সোমার পৃথিবী যেন মুহূর্তেই থেমে যায়। কথা হারিয়ে ফেলে সে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। ঠিক তখনই শাশুড়ির ডাক তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।

    কীভাবে এই ভয়ংকর সংবাদটি জানাবে?

    মনে পড়ে যায় পবনের শেষ কথা—

    "আমার কিছু হলে মা-বাবাকে ভেঙে পড়তে দিও না।"

    নিজের বুকফাটা কান্না লুকিয়ে সোমা হাসিমুখে বলে,

    — "তোমাদের ছেলে ভালো আছে। শুধু আর বাড়ি ফিরবে না।"

    এরপর দৃঢ় কণ্ঠে জানায়—

    — "আমিও দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করব।"

    কিছুদিন পর সোমা পুলিশের চাকরি পায়।

    নিজের ব্যক্তিগত শোককে বুকে চেপে রেখে সে কর্তব্য পালন করতে থাকে।

    কিন্তু ভাগ্য যেন আরেক নিষ্ঠুর পরিহাস করে।

    কয়েক মাস পর দুষ্কৃতিকারীদের হামলায় সোমাও প্রাণ হারায়।

    তার নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে পবনের বাবা-মা এক ফোঁটা চোখের জলও ফেললেন না।

    তাঁদের কণ্ঠে শুধু একটি বাক্য—

    "সৈনিকের পরিবার কখনও চোখের জল ফেলে না।"


    ২. জীবন সংগ্রাম

    জন্মের পরই মা-কে হারায় তিয়াসা।

    ঠাকুমার স্নেহে বড় হতে থাকে সে। কিন্তু ঠাকুমা নাতি চেয়েছিলেন, নাতনি নয়।

    ছয় মাসের মাথায় বাবা আবার বিয়ে করেন।

    এক বছর পর নতুন মায়ের কোলে আসে একটি ছেলে সন্তান।

    তারপর থেকেই তিয়াসার কপালে জোটে অবহেলা, অপমান আর কুসংস্কারের বোঝা।

    প্রায়ই শুনতে হতো—

    "জন্মেই নিজের মাকে খেয়েছে। ওকে ছেলের কাছ থেকে দূরে রাখো।"

    ষোলো বছর বয়সে ঠাকুমাও মারা যান।

    পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।

    বাবার বক্তব্য ছিল—

    "মেয়ের পড়াশোনায় এত টাকা খরচ করে লাভ কী? বিয়েতেও তো অনেক টাকা লাগবে।"

    এরপর তিয়াসাকে সংসারের কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।

    তবে ছোট ভাই চুপিচুপি দিদিকে সাহায্য করত।

    আর সৎমা, সবার অগোচরে, মাঝে মাঝে হাতে কিছু টাকা তুলে দিতেন।

    অন্যের বই ধার করে পড়ে তিয়াসা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে।

    কিন্তু এরপরই বাবা মারা যান।

    চারদিকে শুরু হয় বিয়ে দেওয়ার চাপ।

    অবশেষে তিয়াসা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়।

    এক বছর পর সে প্রতিষ্ঠিত হয় একজন নামকরা আইনজীবী হিসেবে।

    এদিকে ছোট ভাই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ে।

    সৎমা ভালো উকিলের খোঁজ করতে করতে একদিন পৌঁছে যান তিয়াসার চেম্বারে।

    দেখেন—

    কালো কোট পরে তাঁর সামনেই বসে আছে সেই অবহেলিত মেয়েটি।


    ৩. ভালোবাসার টান

    বাসে পা রেখেই থমকে যায় মৌমিতা।

    এত বছর পর আবার দেবেশ!

    যার সঙ্গে সব সম্পর্ক বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে, আজ তার পাশেই বসে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হবে।

    ফাঁকা সিট আর নেই।

    কলেজ জীবনের এক অনুষ্ঠানে তাদের পরিচয়।

    বন্ধুত্ব।

    তারপর প্রেম।

    প্রথম কয়েক মাস সবকিছুই সুন্দর ছিল।

    কিন্তু অজানা সন্দেহ ধীরে ধীরে দুজনের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়।

    শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক ভেঙে যায়।

    তারপর দুজনেই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

    কেউ আর ফিরে তাকায়নি।

    তবু অদ্ভুতভাবে, গোপনে গোপনে দুজনেই একে অপরের খবর রাখত।

    নতুন করে আর কারও সঙ্গে সম্পর্কেও জড়ায়নি।

    হয়তো সম্পর্ক ভেঙে যায়।

    কিন্তু ভালোবাসা?

    সেটা কি সত্যিই শেষ হয়?

    আসলে সম্পর্ক ভাঙার পেছনে বড় কোনো কারণ সবসময় থাকে না।

    অনেক সময় শুধুই বিশ্বাসের অভাব।

    মানুষ সম্পর্কের ইতি টানে, কিন্তু হৃদয়ের টান মুছে ফেলতে পারে না।

    আর সেই অদৃশ্য ভালোবাসার টানই হয়তো বহু বছর পর আবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় মৌমিতা আর দেবেশকে।


    ৪. মাতৃ হৃদয়

    দশ বছর ধরে বিবাহিত জীবন প্রতিমা ও কমলের।

    তবু সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

    মানত, চিকিৎসা—সবই হয়েছে।

    কিন্তু ফল নেই।

    কমল মুখে কিছু না বললেও, তার আচরণ বদলাতে শুরু করে।

    বাড়ি ফিরতে দেরি।

    রাগ।

    নীরব দূরত্ব।

    পরিবারের সকলেই প্রতিমাকেই দোষ দিতে থাকে।

    কেউ জানতে চায় না, চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রতিমার কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি।

    বরং কমল নিজে পরীক্ষা করাতেই রাজি নয়।

    তার একটাই কথা—

    "ছেলেদের কোনো সমস্যা হয় না।"

    ক্রমশ একাকী হয়ে পড়ে প্রতিমা।

    নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

    একদিন খবরের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে।

    একটি এনজিও অনাথ শিশুদের পড়ানোর জন্য শিক্ষিকা খুঁজছে।

    প্রতিমা সেখানে যোগ দেয়।

    দিনের পর দিন শিশুদের পড়াতে পড়াতে তাদের আপন করে নেয়।

    নিজের মমতায় ভরিয়ে তোলে তাদের জীবন।

    আজ প্রতিমা একজন নয়—

    শত শত সন্তানের মা।

    মাতৃত্ব রক্তের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; ভালোবাসাই তাকে পূর্ণতা দেয়।


    উপসংহার

    রিংকি পালের এই চারটি অণুগল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন কখনও শুধুই সুখের নয়। কখনও দেশপ্রেম, কখনও সংগ্রাম, কখনও হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা, আবার কখনও মাতৃত্বের অমলিন মমতা—এসবই মানুষের জীবনকে পূর্ণ করে। সংক্ষিপ্ত পরিসরেও লেখিকা গভীর মানবিক অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়।


    লেখিকা পরিচিতি

    রিংকি পাল ত্রিপুরার ধর্মনগরের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন শিক্ষিকা। সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই নিয়মিত ছোটগল্প ও অণুগল্প লিখে চলেছেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে— 'জীবন সংগ্রাম', 'সেই রাত', 'মুআফি', 'ফেসবুক ফ্রেন্ড', 'বাড়ি', 'একসপ্তাহ' প্রভৃতি। সহজ-সরল ভাষা ও মানবিক আবেগের মিশেলে তিনি পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন।


    লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী

    আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।

    ইমেল আইডি:
    contact.okopotanusandhan@gmail.com

    লেখার ফরম্যাট:
    অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিবোর্ডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।

    ইমেলে যা উল্লেখ করবেন:

    • আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
    • কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    0মন্তব্যসমূহ
    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
    To Top