সঞ্চিতা ঘোষের ২টি হৃদয়স্পর্শী গল্প
লেখিকা: সঞ্চিতা ঘোষ
মানুষের জীবন শুধুই সুখ-দুঃখের সমষ্টি নয়, বরং শিক্ষা, বিশ্বাস, সম্পর্ক এবং সমাজের নানা বাস্তবতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। লেখিকা সঞ্চিতা ঘোষ তাঁর গল্পে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন পারিবারিক শিক্ষা, সন্তানের প্রতি আস্থা, সামাজিক কুসংস্কার এবং মানবিক সম্পর্কের গভীরতা। এখানে প্রকাশিত দুটি গল্প— 'টাকা চুরি' এবং 'পৃথকীকরণ'— আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং মানবিকতার মূল্য উপলব্ধি করায়।
১. টাকা চুরি
"ঋতু, এদিকে এসো তো মা।"
মা ব্যাগ থেকে টাকা খুঁজে না পেয়ে আট বছরের ঋতুকে জিজ্ঞেস করলেন,
— "তুমি কি আমার ব্যাগ থেকে টাকা নিয়েছ?"
ঋতু মাথা নেড়ে বলল,
— "না মা, আমি নিইনি।"
মা আবারও ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বললেন,
— "তোমার বয়স এখনও খুব কম। কেউ যদি তোমাকে ভুল কিছু শেখায়, তাহলে লুকিয়ে রাখবে না। সব কথা আমাকে বলবে।"
ঋতু তবুও অস্বীকার করল।
শেষ পর্যন্ত মা বললেন,
— "আমাকে ছুঁয়ে সত্যি কথা বলো। মিথ্যে বললে কিন্তু মা মরে যাবে।"
শৈশব থেকেই এমন বিশ্বাসে বড় হওয়া ঋতু ভয়ে কেঁপে উঠল।
অবশেষে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে স্বীকার করল—
স্কুলের বড় দিদি পূর্ণিমা তাকে বলেছিল বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে আনতে। না হলে প্রতিদিন তার টিফিন কেড়ে নেবে।
মা মেয়েকে বকাঝকা না করে শান্তভাবে বুঝিয়ে বললেন,
"কেউ যদি তোমাকে আগুন লাগাতে বলে বা কাউকে আঘাত করতে বলে, তুমি কি করবে? ভুল কাজ কখনও অন্যের কথায় করা যায় না।"
ঋতু নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইল।
সেদিনই মা ঋতুকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন পূর্ণিমাদের বাড়িতে।
প্রথমে পূর্ণিমা সব অস্বীকার করলেও, কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সত্যি স্বীকার করে নেয়।
তখন ঋতুর মা বললেন,
"আমি আমার মেয়েকে সন্দেহ করিনি, সত্যটা যাচাই করতে এসেছিলাম। ও তোমার থেকে অনেক ছোট। পারলে ওকে নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসো, ভুল পথে চালিও না।"
কথাগুলো বলে তিনি মেয়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরে এলেন।
গল্পের বার্তা
শিশুর ভুলের পেছনে অনেক সময় অন্যের প্রভাব কাজ করে। তাই শাস্তির আগে সত্য জানার চেষ্টা এবং সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
২. পৃথকীকরণ
বাড়িতে ছোট ছেলে দীপুর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান।
চারদিকে আনন্দের আবহ।
ঠিক তখনই ঘরে এসে দাঁড়ালেন বড় বউমা সুজাতা।
স্বামীকে হারানোর পর থেকেই তিনি বিধবা।
তাকে দেখেই শাশুড়ি শান্তা দেবী রাগে বলে উঠলেন—
"বিধবা হয়ে শুভ অনুষ্ঠানে এসেছো কেন? বড় ছেলেকে তো খেয়েছো, এবার ছোট ছেলেকেও খাবে নাকি?"
অপমান সহ্য করতে না পেরে সুজাতা কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে ফিরে যান।
দরজা বন্ধ করে রাধামাধবের মূর্তির সামনে বসে শুধু একটাই প্রশ্ন করতে থাকেন—
"আমার স্বামীকে নিয়ে গেলে, আমাকেও নিয়ে গেলে না কেন?"
এদিকে অনুষ্ঠান শেষ হলেও দীপু বারবার বৌদিকে ডাকতে থাকে।
কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।
বিয়েতে যাওয়ার আগে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে শুধু প্রণাম করে বলে—
"আমি জানি তুমি আর বেরোবে না। তবুও আমাকে আশীর্বাদ করো।"
পরদিন নতুন বউ প্রিয়াকে নিয়ে ফিরে এসে আবার বৌদির দরজায় কড়া নাড়ে।
প্রিয়া স্নেহভরা কণ্ঠে বলে—
"বৌদি, আমাকে কি তোমার ভালো লাগেনি?"
এই কথায় সুজাতার অভিমান ভেঙে যায়।
দরজা খুলে তিনি প্রিয়াকে বুকে টেনে নেন।
দীপু ও প্রিয়া তাঁর আশীর্বাদ নেয়।
কিন্তু দূর থেকে সব দেখে শাশুড়ির কণ্ঠে আবারও ভেসে আসে তাচ্ছিল্যের সুর।
গল্পের বার্তা
বিধবাদের প্রতি সমাজের কুসংস্কার ও বৈষম্য আজও অনেক পরিবারে বিদ্যমান। অথচ একজন মানুষের পরিচয় তার বৈবাহিক অবস্থায় নয়, তার মানবিকতায়। এই গল্প সেই সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
উপসংহার
সঞ্চিতা ঘোষের এই দুটি গল্প পাঠককে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথম গল্পে রয়েছে সন্তানের প্রতি বিশ্বাস, সঠিক শিক্ষা ও সচেতন অভিভাবকত্বের বার্তা। দ্বিতীয় গল্পে উঠে এসেছে সমাজের কুসংস্কার, বিধবা নারীর প্রতি বৈষম্য এবং ভালোবাসার শক্তি। সহজ ভাষা, বাস্তবধর্মী কাহিনি এবং গভীর মানবিক অনুভূতি— এই গল্প দুটিকে করে তুলেছে হৃদয়স্পর্শী।
লেখিকা পরিচিতি
সঞ্চিতা ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাসিন্দা। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর। গত প্রায় এক বছর ধরে তিনি অকপট অনুসন্ধান অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর লেখা অণুগল্প, ছোটগল্প ও কবিতা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় সমাজের বাস্তব চিত্র ও মানবিক অনুভূতি তুলে ধরাই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
লেখার ফরম্যাট
অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিবোর্ডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন
- আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
- কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা অবশ্যই উল্লেখ করবেন।

