আত্মার অলিন্দে
লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ পাইন
ভূমিকা: আত্মার অবিনশ্বরতা
সনাতন দর্শনের মূলে রয়েছে আত্মার অবিনশ্বরতা। আত্মা অমর—তার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ভাষায়:
"না জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ... ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে" (গীতা ২/২০)
অর্থাৎ, শরীর বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। এটি জন্ম-মৃত্যু রহিত, অক্ষয় এবং চিরন্তন। শৈশব থেকে যৌবন, তারপর বার্ধক্য—শরীরের এই পরিবর্তন প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। এই দেহান্তরকে যারা ধীর স্থিরভাবে মেনে নিতে পারেন, তারাই প্রকৃত জ্ঞানী।
আধ্যাত্মিক সাধনা ও চেতনার জাগরণ
সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে হলে কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, প্রয়োজন আত্মার প্রকৃত বিকাশ। অনুভূতির আসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে দরকার নীরব ও নিবিড় তপস্যা। এই সাধনায় বেলপাতা বা দুর্বার চেয়েও বড় উপকরণ হলো চৈতন্য, অকপট ভক্তি এবং নিষ্ঠা।
আধুনিক জীবনের ফাঁকিবাজি ও অন্তরালের শক্তি
আমরা বর্তমান যুগের মানুষেরা অনেক ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতার নামে নিজেদের ফাঁকি দিই। আমরা ভাবি, আমাদের অন্তরের খবর কেউ জানে না। লেখক এখানে একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন—বিদ্যুতের সুইচে চাপ দিলে আলো জ্বলে বা পাখা ঘোরে, কিন্তু সেই অদৃশ্য বিদ্যুৎ শক্তিকে আমরা দেখতে পাই না। ঠিক তেমনি, আমাদের জীবনের সকল কর্মের পেছনে কাজ করছে এক অন্তরালবর্তী মহান শক্তি। আমরা মোহগ্রস্ত হয়ে এই শক্তিকে ভুলে যাই এবং 'আমি' বা অহংকারে লিপ্ত হয়ে জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হই।
দুঃখের কণ্টক ও ঈশ্বর দর্শন
জীবন মানেই ঘাত-প্রতিঘাত। গোলাপ তুলতে গেলে যেমন কাঁটার আঁচড় সইতে হয়, তেমনি সত্য বা ঈশ্বর দর্শনের পথেও দুঃখ, লাঞ্ছনা ও ছলনা আসবে। কিন্তু জ্ঞান, ভক্তি আর নিষ্ঠা থাকলে এই প্রতিকূলতা পেরিয়েই পরমাত্মার দেখা পাওয়া সম্ভব।
উপসংহার: আত্মোপলব্ধির পথ
আত্মোপলব্ধি কেবল পুথিগত বিদ্যায় সম্ভব নয়। সমস্ত প্রাণীর মধ্যে নিজেকে অভিন্ন দেখতে পারাই হলো যোগীর প্রকৃত লক্ষণ। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:
"আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোহর্জুন... স যোগী পরমো মতঃ" (গীতা ৬/৩২)
অর্থাৎ, যিনি নিজের মতো করেই সর্বত্র সুখ ও দুঃখকে সমানভাবে দেখেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী। আত্মাকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে 'আত্মার অলিন্দে' বা অন্তরের নিভৃত কক্ষে প্রবেশ করাই মানবজীবনের চরম সার্থকতা। সেই পরমাত্মার সাথে নিজের আত্মাকে মিলিয়ে দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করাই এখনকার সময়ের বড় প্রয়োজন।
নিবন্ধের তথ্যসূত্র (References):
১. গীতা (২/২০): আত্মার জন্মহীনতা ও অবিনশ্বরতা বিষয়ক শ্লোক।
২. গীতা (২/১৩): দেহান্তর প্রাপ্তি এবং ধীর ব্যক্তির অবিচলতা সংক্রান্ত শ্লোক।
৩. গীতা (৬/৩২): 'আত্মৌপম্য' বা সর্বভূতে সমদর্শী হওয়া সম্পর্কিত শ্লোক।
৪. মূল লেখক: সত্যেন্দ্রনাথ পাইন (নিবন্ধটির মূল ভাব ও রূপক ধর্মী ব্যাখ্যা লেখকের স্বকীয়)।
লেখা পাঠানোর নিয়মাবলী
আপনারা আপনাদের মূল্যবান লেখা নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন। আমরা তা আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশ করব।
ইমেল আইডি: contact.okopotanusandhan@gmail.com
লেখার ফরম্যাট: অভ্র ইউনিফাইড টাইপ কিপ্যাডে টাইপ করে লেখা পাঠাতে হবে।
ইমেলে যা উল্লেখ করবেন: আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং কোন ক্যাটাগরিতে লিখছেন তা উল্লেখ করতে ভুলবেন না।


